বিনোদন

চলে গেছেন না ফেরার দেশে, কিংবদন্তি লতার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে জেনে নিন

উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকর। যিনি দশকের পর দশক ধরে আসমুদ্রহিমাচল মোহিত থেকেছে তার জাদুমাখা কণ্ঠে। শনিবার সকালে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। জানুয়ারির শুরুতে করোনা পজিটিভ আসে তাঁর। ৮ জানুয়ারি ভর্তি হন মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে। করোনা কাটিয়ে উঠলেও ৯২ বছর বয়সে কোভিড পরবর্তী অসুস্থতার ধাক্কা সামলাতে পারলেন না শিল্পী।

১৯২৯ সালে ইন্দোরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সদ্য লতা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন সবচেয়ে বড়। তাঁর বাবা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর মারাঠি ও কোঙ্কিণী সংগীতশিল্পী ছিলেন। পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন। ছোটবেলায় বাড়িতে কে এল সায়গল ছাড়া আর কোনো ছবির গান গওয়ার অনুমতি ছিল না।

তবে লতার শুরুটা কিন্তু গায়িকা হিসেবে নয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে অভিনেত্রী হিসাবে কাজ করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। সেই সময় বাবাকে হারান গায়িকা। পাঁচ ভাই-বোনের কথা ভেবে ওই বয়সেই হাল ধরেন সংসারের।

১৯৪২ সালে একটি মারাঠি ছবির সৌজন্যে প্রথম গান রেকর্ড করেন লতা। পরের বছর মারাঠি ছবি ‘গাজাভাউ’-এর জন্য ‘মাতা এক সুপুত কি দুনিয়া বদল দে তু’ গানটি রেকর্ড করেন তিনি। এটি ছিল তাঁর প্রথম হিন্দি গান। এরপর লতার মুম্বাইয়ে যাওসা এবং ওস্তাদ আমান আলি খানের কাছে ধ্রুপদী গানের তালিম পর্ব শুরু।

ধীরে ধীরে বলিউডে পায়ের নীচের মাটি শক্ত করতে শুরু করেন লতা মঙ্গেশকর। যদিও পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন তিনি। প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায় ‘শহীদ’ ছবিতে লতাকে দিয়ে গান গাওয়াতে রাজি হননি। সংগীত পরিচালক গুলাম হায়দারকে তিনি বলেছিলেন, ‘মেয়েটার গলাটা বড্ড সুরু’।

মিউজিক ডিরেক্টর গুলাম হায়দার পালটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিলেন, আগামীদিনে এই মেয়েকে দিয়ে গান গাওয়াতে পায়ে ধরবে গোটা বলিউড। এরপর তাঁর হাত ধরেই বলিউডে প্রথম বড় ব্রেক পান লতা। মজবুর (১৯৪৮) ছবির ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝে কাহিন কা না ছোড়া’ গানটি রেকর্ড করেন তিনি।

একবার একটি সাক্ষাৎকারে লতা স্বীকার করেছিলেন যে, ‘গুলাম হায়দার আমার গডফাদার’। শুরুর দিকে লতার গায়েকিতে নূর জাহানের ছাপ খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। তবে দ্রুত তা কাটিয়ে উঠে নিজস্ব স্টাইল তৈরি করেছিলেন সুরসম্রাজ্ঞী। লতা মঙ্গেশকর তার সাত দশকের ক্যারিয়ারে ৩০ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন। গান গেয়েছেন ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষায়।

অনিল বিশ্বাস, এসডি বর্মন, সলিল চৌধুরীর মতো সংগীত পরিচালকদের পছন্দের গায়িকা ছিলেন লতা। অনেকেই হয়ত জানেন না, আরডি বর্মনের ক্যারিয়ারের প্রথম ও শেষ গানটি লতার কণ্ঠে রেকর্ড করা। নতুন শতাব্দীতে গানের জগত থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তবুও ‘বীর জারা’, ‘রং দে বসান্তি’র মতো ছবির অ্যালবামের শোভা বাড়িয়েছে তার সুমধুর কণ্ঠ।

২০১৯ সালে ভারতীয় আর্মিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দেন লতা, রেকর্ড করেন ‘তেরি মিট্টি কি সওগন্ধ’, এটিই লতা মঙ্গেশকরের রেকর্ড করা শেষ গান। লতা মঙ্গেশকরের বিখ্যাত গানের তালিকা অগনিত, ‘অ্যায় মেরে বতন কে লোগো’, ‘লাগ জা গালে’, ‘চলতে চলতে’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’- এই তালিকা শেষ হওয়ার নয়।

ভারতীয় সংগীতের দুনিয়ায় লতা মঙ্গেশকরের অবদান ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৮৯ সালে, তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান। ২০০১ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসমারিক নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়েছিল লতা মঙ্গেশকরকে।

২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাদের দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার (অফিসার অফ দি লেজিয়ান অফ অনার) দিয়ে সম্মানিত করে লতা মঙ্গেশকরকে। আক্ষরিক অর্থেই তিনি সুরের সরস্বতী, আর ভগবান তো অবিনশ্বর, তাই সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে এভাবেই চির ভাস্বর হয়ে থাকবেন তিনি।

Back to top button